ইউজিসি’র নাম ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ করার প্রস্তাব
ইউজিসি’র নাম ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ করার প্রস্তাব
চেয়ারম্যানকে পূর্ণ মন্ত্রী ও সদস্যদের প্রতিমন্ত্রী করার সুপারিশ
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন-ইউজিসি) নাম পাল্টে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব গেছে। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে কমিশনের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাব করা হয়েছে। একই প্রস্তাব জাতীয় শিক্ষানীতিতে সন্নিবেশিত করতে নীতি প্রণয়ন কমিটিকেও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে বের করে এনে দেশে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে ৫০টি প্রস্তাব সংবলিত ১৮ পৃষ্ঠার একটি সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে ইউজিসি। এ সুপারিশমালাও শিগগিরই সরকারকে দেওয়া হবে। ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম এসব তথ্য জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া ইউজিসির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩১টি পাবলিক ও ৫১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। চাহিদা বাড়ার কারণে আরও নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে। ইউজিসি’র নাম ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন’ হলেও এটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো ধরনের মঞ্জুরি দেয় না। প্রতিষ্ঠানটি শুধু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে মঞ্জুরি দিয়ে থাকে। তাই নামকরণের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব ও কার্যাবলির চরম অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এ কারণে ইউজিসির নতুন নামকরণ জরুরি। এক্ষেত্রে নাম হতে পারে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ’। এর চেয়ারম্যানকে পূর্ণমন্ত্রী এবং সদস্যদের প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এ কমিশনকে কেবল সুপারিশ করার ক্ষমতা না দিয়ে ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ গ্রহণের ক্ষমতা দিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে।
ইউজিসি তাদের সুপারিশের যৌক্তিকতা তুলে ধরে জানিয়েছে, দেশে বর্তমান চাহিদানুযায়ী উচ্চশিক্ষার পরিধি যে হারে বাড়ছে তাতে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য একটি ‘হায়ার এডুকেশন কমিশন’ বা ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন’ গঠন করতেই হবে। প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে স্বতন্ত্র ও পৃথক 'উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর এ কাজগুলো শুরু করার এখনই সময় বলে সুপারিশে উলে¬খ করা হয়েছে।
উচ্চশিক্ষায় নানা পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ইউজিসি বলেছে, বর্তমানে যে সংখ্যক শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস করে তার মাত্র ১০ ভাগ ভর্তি হয় উচ্চশিক্ষায়। বাকিরা ঝরে পড়ে। তাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ২০২০ সালের মধ্যে দেশে আরও ২৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই খাতে ৩১৯ বিলিয়ন টাকা খরচ হতে পারে বলে ইউজিসির রিপোর্টে ধারণা দেওয়া হয়। বলা হয়, বিশ্বমানের কারিকুলামের স্বার্থে ও ভবিষ্যৎ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম দু’বছর পরপর পরিবর্তন করতে হবে। ডিগ্রি পাস ও কলেজ পর্যায়ের অনার্সের কারিকুলাম ও সিলেবাস একই ধারায় আনতে হবে। উচ্চশিক্ষার অনেকগুলো দুর্বলতার মধ্যে একটি হলো পরীক্ষা পদ্ধতি। এটি সংস্কার করতে হবে।
এছাড়া শুধু গবেষণার জন্য একটি স্বতন্ত্র ‘পোস্ট গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয়’ দরকার বলেও ইউজিসি সুপারিশে বলা হয়েছে। ইউজিসি গবেষণার জন্য ‘জাতীয় গবেষণা কাউন্সিল’ গঠনেরও সুপারিশ করেছে।
দেশের সবচেয়ে পুরনো চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম) আইনের (বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ‘৭৩) সংস্কার প্রসঙ্গে ইউজিসি বলেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসনের ধারণা পুনর্বিবেচনা করে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীদের কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ১৯৭৩-এর বিশ্ববিদ্যালয় আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার বাঞ্ছনীয়।
এছাড়াও ইউজিসি প্রণীত সুপারিশমালায় উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সংখ্যাগত সম্প্রসারণ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, উচ্চশিক্ষার পারস্পরিক বিস্তারণ, ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক বিস্তার, ভর্তির যোগ্যতা বা পশ্চাৎপদ গোষ্ঠীর জন্য অগ্রাধিকার, গুণগত মানোন্নয়ন, অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল, একাডেমিক দক্ষতা উন্নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি বন্ধ, বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও পরীক্ষা এবং গ্রেডিং পদ্ধতি, কোর্স-কারিকুলাম, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও এর বিকেন্দ্রীকরণ এবং কলেজ শিক্ষার মান নির্ণয়ের ব্যবস্থা রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
সুপারিশে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ১৯৭৩-এর সংশোধন এবং প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন, শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা, শিক্ষকদের কনসালট্যান্সি ও খ-কালীন চাকরির জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামো, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কার ও বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ, ছাত্র টিউশন ফি বৃদ্ধি ও দরিদ্রদের বিনামূল্যে পড়া বা বৃত্তি প্রদান, ক্যাম্পাসে পুলিশ ব্যবস্থা চালু, বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি বরাদ্দ কমিয়ে সেগুলোকে স্বনির্ভর করাসহ বিভিন্ন সুপারিশ রয়েছে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, জাতীয় শিক্ষানীতি অনুমোদনের পরই এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে। সরকার এখন শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে। সুপারিশমালাটি চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কাছে দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী খলীকুজ্জামান জানান, ইউজিসির সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। তারা যে বক্তব্য দিয়েছে তা কমিটি জেনেছে।


