॥ এক বছরের প্রাক-প্রাথমিকসহ অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক, দ্বাদশ পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং মাদরাসাসহ সব শিক্ষা ধারায় কিছু অভিন্ন পাঠ্যসূচি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ ॥॥

জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গতকাল বুধবার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০০৯-এর চূড়ান্ত (খসড়া) প্রতিবেদন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের কাছে পেশ করেছেন। বিগত চার মাস ধরে ৫৬টি সংগঠনের সাথে মতবিনিময় শেষে এ চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়া হল। কমিটি শিক্ষার প্রাথমিক স্তরকে ধাপে ধাপে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত, মাধ্যমিক স্তরকে নবম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত, মাদরাসাসহ সব ধারার পাঠ্যসূচিতে কিছু অভিন্ন বিষয় বাধ্যতামূলক এবং একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে এ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আশা করি এ শিক্ষানীতি দেশে গণমুখী, সুষম, সার্বজনীন, সুলভ, সুপরিকল্পিত এবং মানসম্পন্ন শিক্ষাদানে সক্ষম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ‘ভিত্তি রণকৌশল’ হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, সরকার এ প্রতিবেদন নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে ২০০৯-এর ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষানীতি চূড়ান্ত করে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করবে।

তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি আগে পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হবে। পরে মন্ত্রিসভা বৈঠকে তোলা হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এটা বাস্তবায়ন করা হবে। অনুষ্ঠানে কমিটির চেয়ারম্যান জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, কো-চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি বছরের ৬ এপ্রিল জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। কমিটিতে প্রথমে ১৬ সদস্য রাখা হলেও পরে দুইজন সদস্য কো-অপ্ট করা হয়।

প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা : শিক্ষানীতির খসড়ায় ৫ বয়সোধ্ব শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদী প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার সুপারিশ করা হয়। এর জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাড়তি শিক্ষকের পদ সৃষ্টি ও শ্রেণী কক্ষ বৃদ্ধির কথা বলা হয়। প্রতিবেদনে আদিবাসি শিশুরা যাতে তাদের নিজেদের ভাষা শিখতে পারে সে লক্ষ্যে আদিবাসি শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা গ্রহণ, পিছিয়ে পড়া এলাকাসমূহে অবস্থিত স্কুলসহ গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ সহায়তার সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক শিক্ষা হবে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত এবং অবৈতনিক, সার্বজনীন এবং বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার ধারা নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠ্যসূচি অনুযায়ী বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বাংলাদেশ স্টাডিজ, জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিচিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে। ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম পর্যন্ত প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। ৫ম শ্রেণী শেষে সকলের জন্য উপজেলা/পৌরসভা/থানা পর্যায়ে স্থানীয় সমাজ কমিটি/স্থানীয় সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত বৃত্তি দেয়া হবে। এছাড়া সকল শিক্ষার্থীর জন্য নিজ নিজ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।

মাধ্যমিক শিক্ষা: মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর হবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। দ্বাদশ শ্রেণী শেষে মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে সাধারণ, মাদরাসা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ধারায়- বাংলা, ইংরেজী, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ স্টাডিজ শিক্ষায় অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা হবে। ১০ম শ্রেণী শেষে সমাপনী পরীক্ষা উপজেলা/পৌরসভা/থানা পর্যায়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বৃত্তি প্রদান করা হবে।

উচ্চশিক্ষা: ৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি কোর্সকে পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কোর্সে রূপান্তরিত করা হবে। ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কোর্স প্রান্তিক ডিগ্রি হিসাবে গণ্য হবে এবং অনার্স ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকতা ছাড়া অন্য সকল কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্য হবে। তবে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকতার জন্য মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নির্বাচন এবং তাদের প্রশিক্ষণ দানের জন্য বেসরকারি শিক্ষক কমিশন গঠন করা হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে বিভাগীয় সদরে এর কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে এই কেন্দ্রগুলোকে স্ব স্ব এলাকায় অনুমোদনকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে।

বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা: অষ্টম শ্রেণী শেষে প্রাথমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থিগণ ইচ্ছা করলে বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রবেশ করতে পারবে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রতিটি উপজেলায় একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে। এছাড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট ও লেদার ইন্সটিটিউটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। বৃত্তিমূলক ও ডিপ্লোমা পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুবিধাদি ব্যবহার করে সান্ধ্যকালীন ও খন্ডকালীন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে স্কুল পরিত্যাগকারী বয়স্কদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক শিক্ষাদান করে তাদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা হবে। ডিপ্লোমাধারীদের জন্য যথাযথ নির্বাচনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। বেসরকারি খাতে মানসম্পন্ন বৃত্তিমূলক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠান স্থাপনকে উৎসাহিত করা হবে, এমপিও ভুক্তিতে অগ্রাধিকার প্রদান এবং যন্ত্রপাতি, সাজ-সরঞ্জামাদিসহ আর্থিক সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে।

মাদরাসা শিক্ষা: প্রতিবেদনে মাদরাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলা হয়, মাদরাসা শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসুল (স.)-এর প্রতি সরল বিশ্বাস গড়ে তোলা এবং তাদের আচারসর্বস্ব নয় বরং শান্তির ধর্ম ইসলামের প্রকৃত মর্মার্থ অনুধাবনে সক্ষম করে তোলা। শিক্ষার অন্যান্য ধারার সাথে সমন্বয় রেখে ইবতেদায়ী পর্যায়ে নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠ্যসূচি অনুযায়ী নির্ধারিত বিষয়সমূহ বাংলা, ইংরেজী, নৈতিক শিক্ষা, বাংলাদেশ ষ্টাডিজ, গণিত, সামাজিক পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিচিতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে। একইভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ে নির্ধারিত বিষয়সমূহ বাধ্যতামূলক থাকবে।

শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা:

প্রতিবেদনে শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে জাতীয় মর্যাদা বিন্যাস তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করা হবে। তাদের বেতন গ্রেড যথাযথভাবে উন্নীত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনুপাত পদ্ধতি বাতিল করে জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সকল পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের পদায়ন করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের ব্যাপক ও উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০০০ সালে প্রণীত শিক্ষানীতিকে অধিকতর সময়োপযোগী করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- কো-চেয়ারম্যান বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিকা হালিম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট-এর কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মুহঃ জাফর ইকবাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক ড. ফকরুল আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. জারিনা রহমান খান, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র সূত্রধর, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহম্মেদ, অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) সিরাজ উদ্দীন আহমেদ, অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) মোঃ আবু হাফিজ, প্রাক্তন অধ্যক্ষ মাওলানা অধ্যাপক এ বি এম সিদ্দিকুর রহমান, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ এন্ড এসোসিয়েটস-এর সিনিয়র পার্টনার ব্যারিস্টার নিহাদ কবির, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যক্ষ এম. এ আউয়াল সিদ্দিকী এবং নায়েমের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) অধ্যাপক শেখ ইকরামুল কবির, কো-অপ্ট করা সদস্য উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আর আই এম আমিনুর রশিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহীন কবীর। শুরুতে কমিটির প্রথম সভা থেকে তিনমাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা থাকলেও কমিটি আরেক মাস সময় নেয়।

নিজামুল হক ॥ ইত্তেফাক

Last Updated ( Saturday, 05 September 2009 11:51 )