জাতীয় শিক্ষা নীতির কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সুপারিশ
জাতীয় শিক্ষা নীতি কমিটি কর্তৃক সুপারিশকৃত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা
৫ বছর বয়স্ক শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদী প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হবে। এর জন্য প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাড়তি শিক্ষকদের পদ সৃষ্টি ও শ্রেণী কক্ষ বৃদ্ধি করতে হবে। আদিবাসি শিশুরা যাতে তাদের নিজেদের ভাষা শিখতে পারে সেই জন্য আদিবাসি শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করা হবে। পিছিয়ে পড়া এলাকাসমূহে অবস্থিত স্কুলসহ গ্রামীণ বিদ্যালয়গুলোকে বিশেষ সহায়তা দেয়া হবে। প্রাথমিক শিক্ষা হবে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত এবং অবৈতনিক, সার্বজনীন এবং বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক শিক্ষার সময়কাল ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ২০১২ সালের মধ্যে ছয় বছর, ২০১৫ সালের মধ্যে সাত বছর এবং ২০১৮ সালের মধ্যে আট বছর করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমানের পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার স্তর হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার ধারা নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠ্যসূচী অনুযায়ী বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বাংলাদেশ ষ্টাডিজ, জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিচিতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে। ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম পর্যন্ত প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। ৫ম শ্রেণী শেষে সকলের জন্য উপজেলা/পৌরসভা/থানা পর্যায়ে স্থানীয় সমাজ কমিটি/স্থানীয় সরকারের যৌথ ব্যবস্থাপনায় বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত বৃত্তি দেয়া হবে। সকল শিক্ষার্থীর জন্য নিজ নিজ ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে।
মাধ্যমিক শিক্ষা
মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর হবে ৯ম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। দ্বাদশ শ্রেণী শেষে মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। মাধ্যমিক শিক্ষাস্তরে সাধারণ, মাদ্রাসা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ধারায়- বাংলা, ইংরেজী, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ ষ্টাডিজ শিক্ষায় অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি পড়তে হবে। ১০ম শ্রেণী শেষে সমাপনী পরীক্ষা উপজেলা/পৌরসভা/থানা পর্যায়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে। এই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বৃত্তি প্রদান করা হবে।
উচ্চশিক্ষা
৩ বছর মেয়াদী ডিগ্রি কোর্সকে পর্যায়ক্রমে সংশ্লিষ্ট সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কোর্সে রূপান্তরিত করা হবে। ৪ বছর মেয়াদী অনার্স কোর্স প্রান্তিক ডিগ্রি হিসেবে গন্য হবে এবং অনার্স ডিগ্রি অর্জনের পর উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষকতা ছাড়া অন্যান্য সকল কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের যোগ্য হবে। তবে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকতার জন্য মাষ্টার ডিগ্রি অর্জন করতে হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান-এ শিক্ষক নির্বাচন এবং তাদের ও প্রশিক্ষণদানের জন্য বেসরকারি শিক্ষক কমিশন গঠন করা হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিকেন্দ্রীকরণের জন্য বিভাগীয় সদরে এর কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। পরবর্তীতে এই কেন্দ্রগুলোকে স্ব স্ব এলাকায় অনুমোদনকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হবে।
বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা
অষ্টম শ্রেণী শেষে প্রাথমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা ইচ্ছা করলে বৃত্তিমূলক শিক্ষায় প্রবেশ করতে পারবে। বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হবে। এছাড়া পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট ও লেদার ইন্সটিটিউটের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হবে। বৃত্তিমূলক ও ডিপ্লোমা পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুবিধাদি ব্যবহার করে সান্ধ্যকালীন ও খন্ডকালীন শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে স্কুল পরিত্যাগকারী বয়স্কদের বিভিন্ন বৃত্তিমূলক শিক্ষাদান করে তাদেরকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা হবে। ডিপ্লোমাধারীদের জন্য যথাযথ নির্বাচনের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
মাদ্রাসা শিক্ষা
মাদ্রাসা শিক্ষায় অন্যান্য ধারার সঙ্গে সমন্বয় রেখে ইবতেদায়ী পর্যায়ে নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠ্যসূচি অনুযায়ী নির্ধারিত বিষয় অর্থাৎ বাংলা, ইংরেজী, নৈতিক শিক্ষা, বাংলাদেশ ষ্টাডিজ, গণিত, সামাজিক পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণাসহ প্রাকৃতিক পরিবেশ পরিচিতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিজ্ঞান বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে। একইভাবে মাধ্যমিক পর্যায়ে নির্ধারিত বিষয়সমূহ বাধ্যতামূলক থাকবে।
শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা
শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে জাতীয় মর্যাদা বিন্যাস তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার ব্যবস্থা করা হবে। তাদের বেতন গ্রেড যথাযথভাবে উন্নীত করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনুপাত পদ্ধতি বাতিল করে জেষ্ঠ্যতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সকল পদে পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন পর্যায়ে উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের পদায়ন করার পদক্ষেপ। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের ব্যাপক ও উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে।
অভিজিৎ ভট্টাচার্য, আমাদের সময়
Last Updated ( Saturday, 05 September 2009 11:50 )


