উচ্চাকাঙ্ক্ষী শিক্ষানীতির ব্যয় ৬৮ হাজার কোটি টাকা
সদ্য প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতির প্রধান অন্তরায় কী—জবাবে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা। আর এটা সম্ভব না হলে আগের আটটির মতো এই প্রতিবেদনও ধামাচাপা পড়ে যাবে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম অবশ্য আশা প্রকাশ করেছেন, এ বছরের মধ্যেই শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন শুরু হয়ে যাবে, চলবে নয় বছর ধরে।
শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদন বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার অর্থ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্তর ওলটপালট হয়ে যাওয়া। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী মাধ্যমিক পরীক্ষা থাকবে না, প্রাথমিক শিক্ষার পরিধি হবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত চালু থাকা প্রায় ৮০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণী চালু করতে অবকাঠামো খাতেই খরচ হবে ৩০ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। আর শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে মোট সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছে ৬৮ হাজার কোটি টাকা।
স্বাধীনতার পর প্রণীত আটটি শিক্ষানীতির একটিও বাস্তবায়িত হয়নি। এই পরিপ্রেক্ষিতে নবমবারের মতো প্রণীত প্রতিবেদন ঘিরে রয়েছে স্বাভাবিক সংশয়। তবে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, এই শিক্ষানীতি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান বিশৃঙ্খল অবস্থার অবসান ঘটতে পারে।
শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান কবীর চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুগের চাহিদার প্রতি লক্ষ রেখে এই শিক্ষানীতি করা হয়েছে। আমি ও কমিটির সব সদস্য এই প্রতিবেদন নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট এবং এর বাস্তবায়নে গভীরভাবে আশাবাদী।’
একই মত প্রকাশ করে কমিটির সদস্য ও শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, এত সময় ও শ্রম দিয়ে এমন কোনো শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়নি, যেটি নেতিবাচক হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শিক্ষানীতি কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও এর বাস্তবায়ন খুব বেশি কঠিন নয়।’
ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন: শিক্ষানীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কথাটি উল্লেখ করায় ইসলামি দলসহ চারদলীয় জোটের মতাদর্শের অনুসারীরা প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা নেই। এর প্রথমেই বলা হয়েছে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা’। তাঁরা আরও বলছেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা রয়েছে, কিন্তু কৌশলে সংবিধানের দোহাই দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সংবিধান পরিবর্তন না করা পর্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ কথাটি ব্যবহার করা উচিত নয়। শিক্ষানীতিকে বিতর্কিত করতে এটি করা হয়েছে।’ তাঁর মতে, এত বড় একটি উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে শব্দচয়নে সতর্ক থাকা উচিত।
এ প্রসঙ্গে কবীর চৌধুরী বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি একমত হয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করেছে। সরকার এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
মাদ্রাসাশিক্ষার সংস্কার: মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড শুধু ধর্মীয় শিক্ষার মূল্যায়ন করবে। ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় মূল্যায়ন করবে সাধারণ শিক্ষা বোর্ড বা প্রস্তাবিত শিক্ষা কাউন্সিল। জাতীয় শিক্ষানীতির চূড়ান্ত খসড়ায় এ কথা উল্লেখ করায় প্রশ্ন উঠেছে, মাদ্রাসাশিক্ষা দুই ধরনের বোর্ডের আওতায় চলবে কীভাবে?
এ প্রসঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী বলেন, ‘প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর মনে হয়েছে, এটা কিছুটা সমস্যাও তৈরি করতে পারে। তবে প্রতিবেদন দেওয়া হলেও সরকার এ বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। প্রয়োজনে কমিটি সরকারকে সহায়তা করবে। কবীর চৌধুরী আরও বলেন, মাদ্রাসাশিক্ষার মূল লক্ষ্য হবে ধর্মপ্রাণ ও মানবতাবোধসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলা। পাশাপাশি এসব শিক্ষার্থী যাতে প্রতিযোগিতার জন্য উপযুক্ত হয়ে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারে, সেদিকেও লক্ষ রাখা হয়েছে।
তবে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে কওমি মাদ্রাসাশিক্ষা সম্পর্কে তেমন কিছুই বলা হয়নি। যদিও দাখিল ও কওমি মাদ্রাসায় প্রায় সমানসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসা নিয়ে যে অবস্থা চলছে, তাতে এ বিষয়ে গভীরভাবে ভেবেচিন্তে সুপারিশ করা উচিত এবং সেটা হয়ে ওঠেনি।’ তিনি বলেন, প্রতিবেদনে এটাই তাঁর কাছে বড় দুর্বলতা মনে হয়েছে।
‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল বাইরে থাকবে কেন: মাধ্যমিক স্তরের তিন ধারা অর্থাত্ সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাধারায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশ স্টাডিজসহ ছয়টি মৌলিক বিষয়ে অভিন্ন পাঠ্যসূচি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিষয়টিকে স্বাগত জানালেও ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের বেলায় ছাড় দেওয়া হয়েছে। এসব শিক্ষার্থীকে বাংলা, ইংরেজি, গণিতসহ সব ধারার জন্য বাধ্যতামূলক ছয়টি বিষয় পড়তে হবে না।
এ প্রসঙ্গে এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শাখায় ছয়টি বিষয় বাধ্যতামূলক হলে ইংরেজি মাধ্যমে তা প্রয়োগ না করার কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া এসব ছেলেমেয়ে এ দেশেরই সন্তান এবং তাদের এসব বিষয়ে অবশ্যই জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেওয়া উচিত।
একই প্রসঙ্গে কবীর চৌধুরী বলেন, ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের শিক্ষা পরিচালিত হয় বিদেশ থেকে। সে জন্য এটা বাইরে রাখা হয়েছে।
৬৮ হাজার কোটি টাকা: জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে মোট খরচ হবে ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ২০০৮-০৯ সালে শিক্ষা খাতে মোট সরকারি বরাদ্দ ছিল জাতীয় উত্পাদনের ২ দশমিক ২৭ শতাংশ। এটা বছর বছর বেড়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জাতীয় উত্পাদনের ৬ শতাংশ অথবা সাড়ে ৪ শতাংশে (রক্ষণশীল প্রাক্কলন) উন্নীত করা উচিত বলে শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি মত দিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মাপকাঠি অনুযায়ী, একটি রাষ্ট্র তার জাতীয় আয়ের ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭-১৮ সাল পর্যন্ত বিশেষভাবে খরচ বাড়বে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পুনর্বিন্যাস, কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার সব পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তি চালু এবং প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করার জন্য।
শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘৬৮ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে নয় বছরে। শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে এই অর্থ খুব একটা সমস্যা নয়। তবে প্রথম দুই থেকে তিন বছর কিছুটা টানাপোড়েন হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে অর্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ব্যবস্থাপনা। শিক্ষা প্রশাসনকে এত বড় সংস্কার বাস্তবায়নে যোগ্য হতে হবে এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করতে হবে।
শিক্ষার স্তরবিন্যাস: শিশুদের জন্য আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরুর আগে প্রয়োজনীয় মানসিক ও দৈহিক প্রস্তুতি গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করতে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে ধাপে ধাপে আট বছর মেয়াদি করারও সুপারিশ করা হয়। অর্থাত্ প্রাথমিক শিক্ষা হবে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণীর বদলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত। ড. কুদরাত-এ-খুদা কমিশনের প্রতিবেদনেও এ কথা বলা হয়েছিল। এরপর শামসুল হক, মনিরুজ্জামান মিঞাসহ সব কমিশনের প্রতিবেদনে প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অষ্টম শ্রেণী শেষে পাবলিক পরীক্ষা হবে। এ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বৃত্তি দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া দশম শ্রেণীর পর এসএসসি পরীক্ষা নয়, হবে বৃত্তি পরীক্ষা। মাধ্যমিক পরীক্ষা হবে দ্বাদশ শ্রেণী শেষে। আর মাধ্যমিক শিক্ষা স্তর হবে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। নতুন শিক্ষাকাঠামোয় নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী মাধ্যমিক শিক্ষাস্তর হিসেবে বিবেচিত হবে।
প্রবীণ শিক্ষা গবেষক শফিউল আলম বলেন, শিক্ষানীতির প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা শুধু কাগুজে গবেষণা, নাকি বাস্তবায়নযোগ্য শিক্ষার নির্দেশনা হবে, সেই প্রশ্নের সমাধান জরুরি।
নোট-গাইড ও কোচিং: শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি বলেছে, গাইডবই, নোটবই, প্রাইভেট টিউশন, কোচিং প্রভৃতির কারণে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়া ও শিক্ষার মান অর্জন ব্যাহত হচ্ছে। যারা গাইডবই ও নোটবই তৈরি ও সরবরাহ করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে কমিটি মনে করে। এ ছাড়া গাইডবই, নোটবই ও কোচিংয়ের অপকারিতা সম্পর্কে ছাত্রছাত্রীদের সচেতন করতে হবে।
স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রস্তাব: দেশে একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের সুপারিশ্রকরা হয়েছে।্রএ কমিশন জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পরামর্শদানকারী সংস্থা হবে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রণীত মনিরুজ্জামান মিঞা শিক্ষা কমিশনের (২০০৩) প্রতিবেদনেও একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছিল।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে খসড়া শিক্ষানীতির পক্ষে-বিপক্ষে মত দেওয়া যাবে। দলমতনির্বিশেষে যে-কেউ মতামত দিতে পারবেন। এসব মতামত সমন্বয় করে শিক্ষানীতি মন্ত্রিসভায় পাঠানো হবে এবং মন্ত্রিসভা মনে করলে তা পাঠানো হবে জাতীয় সংসদে।
সুত্র : প্রথম আলো


